কার্য বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা

এইচএসসি (বিএমটি) ভোকেশনাল - হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট-২ - প্রতিষ্ঠানের ইউনিট লেভেল কর্মীদের কাজের বিশ্লেষণ | NCTB BOOK
2.8k

কার্য বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য (Objectives of Job Analysis)

কার্য বিশ্লেষণ হলো একটি প্রক্রিয়া যাতে কার্য সম্পাদনের বর্তমান পদ্ধতি, যে অবস্থার মধ্যে কার্যটি করা হয়। সে অবস্থা, অন্যান্য কাজের সঙ্গে এর সম্পর্ক প্রভৃতি বিবরণ তৈরি করা হয়। কার্য বিশ্লেষণের মূল উদ্দেশ্য হলো বর্তমান মুহূর্তে কীভাবে ব্যবসায়ের বিভিন্ন অংশ সম্পাদিত হচ্ছে তা কর্তৃপক্ষকে দেখানো। যেসব উদ্দেশ্যে কার্য বিশ্লেষণ করা হয় তা নিচে বর্ণনা করা হলো—

→ কর্মী সংগ্রহ ও নির্বাচন (Recruitment and selection of employees): কার্য বিশ্লেষণ হলো এমন একটি পদ্ধতি যা দ্বারা প্রত্যেক কার্য সংক্রান্ত তথ্যাবলি নিয়মতান্ত্রিকভাবে খুঁজে বের করে লিপিবদ্ধ করা হয়। এ বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায় কোনো নির্দিষ্ট কাজের জন্য কর্মীদের কী কী গুণাবলি থাকা দরকার। এসব বিষয় সম্পর্কে অবগত থাকায় কর্মী সংগ্রহ ও নির্বাচন সহজ হয়।

→ কার্য মূল্যায়ন (Job evaluation) : প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল পুনঃনির্ধারণ এবং তুলনামূলক ভালো ফলাফল লাভে প্রত্যেকটি কাজের আপেক্ষিক মূল্য নিরূপণ করার কাজকে কার্য মূল্যায়ন বলে। কার্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিভিন্ন কার্য সম্পর্কে প্রাপ্ত সুস্পষ্ট ধারণার ভিত্তিতে প্রত্যেকটি পদের তুলনামূলক গুরুত্ব/মূল্য নির্ধারণ করা সহজ হয়।

→ প্রশিক্ষণ (Training): কর্মীদের প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যেও কার্য বিশ্লেষণ করা হয়। কোনো কাজের ধরন, দায়িত্ব প্রভৃতি সম্পর্কে তথ্য জানার পর ঐ কাজে নিযুক্ত কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়। তাই প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে কার্য বিশ্লেষণ করতে হয়।

চিত্র : প্রশিক্ষণ দান

→ মজুরি নির্ধারণ (Determining the wages) : কর্মীদের মজুরির পরিমাণ নির্ধারণের উদ্দেশ্যে কার্য বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়। এরূপ বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি কাজের প্রকৃতি, গুরুত্ব প্রভৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যায়। ফলে ঐ কাজে নিযুক্ত কর্মীদের মজুরি নির্ধারণের কাজটি সহজ হয়।

→ কর্মীদের বদলি ও পদোন্নতি (Transfer and promotion of employees): কর্মীদের বদলি ও পদোন্নতি প্রদানের উদ্দেশ্যে কার্য বিশ্লেষণ করা হয়। কার্য বিশ্লেষণের পরই কর্মীদের যোগ্যতা বিবেচনা করে তাদেরকে উচ্চ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এছাড়া কর্মীদের এক জায়গা হতে অন্যত্র বদলির ক্ষেত্রেও কার্য বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়।

চিত্র : কর্মীদের পদোন্নতি ও বদলি

→ সুষ্ঠু কার্য পরিবেশ নিশ্চিত করা (Ensuring sound work environment): কার্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কার্য পরিবেশ সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে প্রাপ্ত তথ্যাদির ভিত্তিতে সমস্যাসমূহ চিহ্নিতকরণ এবং কার্য পরিবেশ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নির্ধারণ করা সহজ হয়।

→ সুষ্ঠু পদ বণ্টন (Post distribution ): প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত পছন্দ, সামর্থ্য ও প্রাপ্ত প্রশিক্ষণের চিত্র কার্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাওয়া যায়। এর ভিত্তিতে সুষ্ঠুভাবে পদ বণ্টন করা যায়। এর মাধ্যমে সাংগঠনিক অগ্রযাত্রা জোরদার করা যায়।

→ কার্যফল বা দক্ষতা মূল্যায়ন ( Performance evaluation): কার্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রত্যেকটি কাজের একটি সুষ্ঠু মান নির্ধারণ করা হয়। এভাবে প্রাপ্ত মানদণ্ডের ভিত্তিতে নিয়োজিত কর্মীদের কার্যফল বা দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়। এটি কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণেও সহায়তা করে।

→ শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক জোরদারকরণ (Strengthening the labour management relationship): কার্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের অনেক কাছাকাছি যেতে পারে। এছাড়াও এর মাধ্যমে শ্রমিকদের বিভিন্ন চাহিদা পূরণ করে তাদের উন্নতি সাধনের চেষ্টা করে । এভাবে এটি প্রতিষ্ঠানে শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্কের উন্নয়নে বা জোরদারকরণে ভূমিকা রাখে।

→ দায়িত্ব পালন যাচাইকরণ (Verifying responsibility): বিভিন্ন পদে কর্মরত ব্যক্তিদের আন্তরিক দায়িত্ব পালন সাংগঠনিক লক্ষ্যার্জনের জন্য আবশ্যক। কার্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে কর্মীদের দায়িত্ব পালনের যে চিত্র পাওয়া যায় তার ভিত্তিতে এর উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়।

পরিশেষে বলা যায়, সুষ্ঠুভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কার্য সম্পাদনের জন্য কার্য বিশ্লেষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এর মাধ্যমে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজার তার কাজ সঠিকভাবে করতে পারে। আর, উপরিউক্ত উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানে কার্য বিশ্লেষণ করা হয়।

 

কার্য বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা (Necessity of Job Analysis) 

প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণ করার জন্য তথ্য সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করার নাম কার্য বিশ্লেষণ। এই কার্য বিশ্লেষণ করা কর্মী বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ বিশ্লেষণের যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। নিচে এর প্রয়োজনের বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হলো—

→ পদ মূল্যায়ন (Post evaluation) : কোনো পদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নির্ণয়কে পদ মূল্যায়ন বলে। প্রতিষ্ঠানের কার্য বিশ্লেষণের ফলে পদ মূল্যায়ন করা সহজ হয়। এরূপ বিশ্লেষণের ওপর পদ মূল্যায়নের সফলতা নির্ভর করে। আর একটি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা পরিমাপের জন্য পদ মূল্যায়ন করার প্রয়োজন হয়। তাই কার্য বিশ্লেষণ একটি জরুরি বিষয়।

→ উৎপাদন পদ্ধতির উন্নয়ন (Developing the production system): বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে সফলতার জন্য উন্নত প্রযুক্তির বিকল্প নেই। আর, উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত করতে হলে কার্য বিশ্লেষণ অপরিহার্য। এরূপ কার্য বিশ্লেষণ নতুন ও উন্নত উৎপাদন পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার স্তর নির্ধারণে সহায়তা করে থাকে।

চিত্র: উৎপাদনের প্রক্রিয়া

→ হিউম্যান রিসোর্স পরিকল্পনা (Human resource planning) : শিল্প কারখানার শ্রমিকদের অসন্তোষের কারণ অনুসন্ধান করতে হলে কার্য বিশ্লেষণের সাহায্য নিতে হয়। কার্য বিশ্লেষণে প্রতিটি কাজের বৈশিষ্ট্যকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করা হয়। কর্মীদের যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজের মিল না থাকলে সেখান থেকে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। এরূপ কার্য বিশ্লেষণের ফলে হিউম্যান রিসোর্স পরিকল্পনা সঠিকভাবে করা তুলনামূলক সহজ হয়।

→ পরিচালনার সুবিধা ( Advantage of direction) কার্য বিশ্লেষণ একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। এ থেকে কোনো কাজ সম্বন্ধে জানার পর ঐ কাজের জন্য উপযুক্ত কর্মীদের যোগ্যতা ও কর্ম প্রবণতা সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যায় । এতে কর্মীদের মধ্যে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া যায় ।

→ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি (Training program) : কার্য বিশ্লেষণ দ্বারা কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজের বৈশিষ্ট্য এবং ঐ কাজে কোন ধরনের যোগ্যতার কর্মী নিয়োগ করা যায় তা জানা যায়। ফলে প্রত্যেক কাজের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কার্যকর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা যায়। এভাবে প্রশিক্ষণ সফল করার জন্য কার্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

→ মজুরি ও বেতন নির্ধারণ (Determining the wages and salaries): কার্য বিশ্লেষণ থেকে একটি কাজ এবং এতে নিযুক্ত কর্মী সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। এসব তথ্য কর্মীদের বেতন ও মজুরি নির্ধারণে সহায়তা করে। তাই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কাজের জন্য পৃথক পৃথক মজুরি ব্যবস্থা নির্ধারণ করার জন্য কার্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন ।

→ কর্মী নির্বাচন (Selection of employees) : কর্মী নির্বাচনের জন্য কার্য বিশ্লেষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ ধরনের বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায় কী ধরনের কর্মী নির্বাচন করতে হবে এবং তাদের কী ধরনের যোগ্যতার প্রয়োজন। তাই, কর্মী নির্বাচন সুষ্ঠু ও বাস্তবভিত্তিক করতে হলে কার্য বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি।

চিত্র : কর্মী বাছাই ও নির্বাচন

 →কর্মী প্রশাসন (Employee administration): কার্য বিশ্লেষণে, কার্য মূল্যায়ন, কার্যফল মূল্যায়ন, কর্মীদের দায়িত্ব পালন যাচাই প্রভৃতি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এভাবে কার্য বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় একটি পদের গুরুত্ব, দায়িত্ব এবং কর্মীর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, দায়িত্ববোধসহ সার্বিক যোগ্যতা যাচাই করা যায়। এগুলোর সহায়তায় কর্মীদের পরিচালনা করা সহজ হয় ও সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

→ মজুরি ও বেতন প্রশাসন (Pay administration): কার্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে কর্মীর দায়িত্ব, কর্তব্য, দক্ষতা, কার্য সম্পাদন প্রভৃতি বিষয়াদির যথাযথ মূল্যায়ন সম্ভব হয়। ফলে কার্যের সঠিক মূল্য নিরূপণের মাধ্যমে বেতন ও ভাতাদি নির্ধারণ করা সহজ হয়।

→ কার্য পরিবেশ উন্নয়ন (Developing job environment ) : সুষ্ঠু কার্য পরিবেশ কাজ করার জন্য জরুরি। কার্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে কার্য সম্পাদনের প্রয়োজনীয় পরিবেশ সম্বন্ধে একটি সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। এতে সুষ্ঠু পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের থেকে ভালো কাজ পাওয়া সম্ভব হয়।

পরিশেষে বলা যায়, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বা হাতিয়ার হলো কার্য বিশ্লেষণ। বিভিন্ন উদ্দেশ্যে এটি পরিচালনা করা হয়। আর, উপরিউক্ত কারণে কার্য বিশ্লেষণ করা প্রতিষ্ঠানের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি বিষয়।

Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...